ভারতের আলোচিত তেহেলকা সাময়িকীর সাবেক সম্পাদক তরুণ তেজপালকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন বোম্বে হাইকোর্ট। ২০২১ সালে নিম্ন আদালত তাঁকে খালাস দিলেও, হাইকোর্ট সেই রায় বাতিল করে ৬১ বছর বয়সী তেজপালকে এই সাজা প্রদান করেন। বিচারপতি নীলা গোখলে ও বিচারপতি অমিত জামসানদেকরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন।
২০১৩ সালে গোয়ার একটি পাঁচ তারকা হোটেলে আয়োজিত ‘থিংকফেস্ট’ সম্মেলন চলাকালে এক জুনিয়র সহকর্মীকে হেনস্তার অভিযোগে এই মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৬ ধারায় তেজপালকে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া ৩৫৪ (এ) ধারায় ১ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ৩৫৪ (বি) ধারায় ৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সব সাজা একসঙ্গে চলায় তাঁকে মোট ১০ বছর কারাভোগ করতে হবে।
আদালত তেজপালকে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার জন্য চার সপ্তাহ সময় দিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৬, ৩৫৪ (এ), ৩৫৪ (বি), ৩৪১ এবং ৩৪২ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছিল। উল্লেখ্য, ২০২১ সালের মে মাসে গোয়ার একটি দ্রুতবিচার আদালত পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাব দেখিয়ে এবং অভিযোগকারীর বক্তব্যকে অসংলগ্ন দাবি করে তেজপালকে খালাস দিয়েছিলেন।
তৎকালীন অতিরিক্ত সেশন জজ ক্ষমা জোশি জানিয়েছিলেন, তেজপাল নিজেকে নির্দোষ দাবি করায় সন্দেহের সুবিধা তাঁকে দেওয়া হয়েছে। তবে হাইকোর্টে আপিল করার সময় সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা যুক্তি দেন যে, নিম্ন আদালত ভুক্তভোগীর জবানবন্দিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। গোয়া পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, যৌন নির্যাতন ও অপরাধমূলক বলপ্রয়োগের স্পষ্ট বিবরণ থাকা সত্ত্বেও আদালত ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেননি।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে সিসিটিভি ফুটেজ, ই-মেইল, হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা ও সাক্ষীদের জবানবন্দি উপস্থাপন করে দাবি করা হয় যে, ভুক্তভোগী ঘটনার পর স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেছিলেন। রাজ্য সরকার যুক্তি দেয়, যৌন নির্যাতনের শিকার একজন ব্যক্তি কেমন আচরণ করবেন—সেই ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করেই নিম্ন আদালত ভুক্তভোগীর বক্তব্যকে অবিশ্বাস্য বলে ধরে নিয়েছিলেন।
বিবাদীপক্ষ অবশ্য ঘটনার পরবর্তী সময়ে ভুক্তভোগীর আচরণের অসংগতি তুলে ধরে। তাদের দাবি, অভিযোগকারী ঘটনার পরেও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন এবং তেজপালকে ফোন করে হলিউড অভিনেতা রবার্ট ডি নিরোর সঙ্গে ছবি তোলার অনুরোধ করেছিলেন। বিবাদীদের মতে, এটি প্রসিকিউশনের সেই দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক যেখানে বলা হয়েছিল যে ভুক্তভোগী আসামিকে ভয় পাচ্ছিলেন।
২০১৩ সালের নভেম্বরে তেহেলকার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো একটি ফাঁস হওয়া ই-মেইলে তেজপাল ঘটনাটিকে ‘বিবেচনার চরম ভুল’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে তিনি দাবি করেন যে তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে। মামলাটি দীর্ঘ সময় ধরে আইনি জটিলতায় আটকে ছিল। ২০১৭ সালে বিচারকাজ শুরু হলেও তেজপাল অব্যাহতি চেয়ে উচ্চ আদালতে আবেদন করেছিলেন।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বিচার শেষ করার কথা থাকলেও কোভিড মহামারির কারণে সময়সীমা বাড়ানো হয়। ২০১৯ সালে বিচারপ্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হয় এবং ২০২০ সাল থেকে প্রতিদিন শুনানি চলে। এই মামলাটি কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিরাপত্তা এবং হয়রানির অভিযোগ প্রকাশে ভীতি নিয়ে ভারতে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
অভিযোগকারীর ভাষ্যমতে, ২০১৩ সালের ৭ নভেম্বর হোটেলের লিফটে তাঁকে হেনস্তা করা হয় এবং পরদিন আবারও একই ধরনের চেষ্টা চালানো হয়। গোয়া পুলিশের তদন্তে উঠে আসে যে, হোটেলের লিফটে কোনো ক্যামেরা ছিল না, যার ফলে সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনার সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ ও সাক্ষীর জবানবন্দির ভিত্তিতেই হাইকোর্ট এই চূড়ান্ত রায় দিয়েছেন।
নিম্ন আদালতের ২০২১ সালের খালাসের রায় বাতিল করে তেহেলকা পত্রিকার ৬১ বছর বয়সী সাবেক সম্পাদককে সাজার আদেশ দেন হাইকোর্ট।
এর অর্থ হচ্ছে, তাঁকে মোট ১০ বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
তেজপালের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৬ (ধর্ষণ), ৩৫৪ এ (যৌন হয়রানি), ৩৫৪ বি (নারীকে বিবস্ত্র করার উদ্দেশ্যে হামলা), ৩৪১ (বেআইনিভাবে পথ রোধ করা) এবং ৩৪২ (বেআইনিভাবে আটকে রাখা) ধারায় মামলা করা হয়েছিল।
দিল্লির একটি বাসে ২৩ বছর বয়সী এক ছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা সারা দেশে ক্ষোভের সৃষ্টি এবং এ ধরনের অপরাধ রোধে কঠোর আইন পাসে ভারত সরকারকে বাধ্য করার এক বছর পর এ মামলা হয়।
এই মামলার বিচারকাজ ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হয়েছিল।
প্রসিকিউশন তেজপালের খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করে যুক্তি দেখান, তেজপালের পরিবর্তে অভিযোগকারীকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে।
সূত্র: Prothom Alo – International


মন্তব্য